স্বামীবাগ আশ্রম

স্বামীবাগ আশ্রম এবং ত্রিপুরলিঙ্গ স্বামী মহারাজ

ভারতবর্ষের কন্যাকুঞ্জে জীবেশ্বর তেওয়ারী নামে এক প্রাজ্ঞ শাস্ত্রজ্ঞ ভগবৎ পরায়ণ ও নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি একসময় তাঁর আসন্ন প্রসবা সহধর্মিনী শ্রীমতি হরপ্যায়ী দেবীকে নিয়ে কল্পবাস ও স্নান উপলক্ষে এলাহাবাদ প্রয়াগরাজ ত্রিবেনীতে আসেন। সেখানে পূর্ব পরিচিত এক মহাত্মার সাক্ষাৎ হয়, যাকে পণ্ডিতজী এক সময় কিছু দান করতে চাইলে মহাত্মা যথাসময়ে চেয়ে নেবেন বলেছিলেন। তারপর ১১৭৯ বাং শ্রীশ্রীরামনবমী তিথিতে হরপ্যায়ী দেবী অতি সুশ্রীকান্তি ও দিব্য জ্যোতি সম্পন্ন এক পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। প্রয়াগ তীর্থে জন্মেছে বলে পণ্ডিতজী নাম রাখলেন প্রয়াগনারায়ণ ও জীবানন্দ এবং ত্রিবেনীতীর্থে জন্ম হওয়ায় মাতা বেণীমাধব বলে ডাকতেন।

উপনয়ন হওয়ার কিছু দিন পর সেই মহাত্মা এসে পণ্ডিতজীর নিকট বেণীমাধবকে প্রার্থনা করলেন। জীবেশ্বর তেওয়ারী ও হরপ্যায়ী দেবীর কষ্ট হলেও পূর্ব প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী ছেলেকে দান করেন। তারপর বেণীমাধব সেই মহাত্মার সাথে গমন করেন। কয়েক বছর পর সেই মহাত্মা বেণীমাধবকে গৃহে নিয়ে আসলেন এবং তাঁকে গৃহস্থ্য আশ্রমে থাকার জন্য বললেন। সাথে সাথে এও বললেন কিছুদিন পর তাকে এসে নিয়ে যাবেন।

এক বছর পর সেই মহাত্মার আদেশমত বেণীমাধবের পিতা একাদশ বর্ষীয়া শ্রীমতি গঙ্গাদেবীর সাথে বেণীমাধবের বিবাহ দেন। তারপর একরাতে বেণীমাধব স্বপ্নে দেখেন মহাত্মা তাঁর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “বৎস এখনও কি তুমি ভোগ বিলাসে তৃপ্ত হওনি, পুত্রের মুখ দেখে কি আরও মোহে পড়বে, এখনই চলে এসো, বৃথা সময় নষ্ট করো না।” তারপর একদিন তিনি গৃহ ত্যাগ করলেন। কিছুদিন পর মহাত্মা বেণীমাধবকে নিয়ে তীর্থ পর্যটনে বের হলেন।

তারা গঙ্গা তীরে বিঠোর নামক স্থানে এসে উপস্থিত হলেন। সেখানে মহাত্মাজী তাঁর দেহ রাখার পূর্বে বললেন, “প্রথমে রামেশ্বর ক্ষেত্রে তোমার সাথে এক মহাত্মার সাক্ষাৎ হবে পরে হিমালয় প্রদেশে এক মহাপুরুষের সাক্ষাৎ হবে এবং তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করে তোমার জীবনের বিশেষ  পরিবর্তন সাধিত হবে”। প্রায় ছয় মাস পর রামেশ্বরে তৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সেখানে তিনি বেণীমাধবকে দীক্ষিত করার জন্য অপেক্ষা করছেন। দীক্ষার পর বেণীমাধবের নাম হয় ত্রিপুরলিঙ্গ স্বামী। তিনি কিছুদিন পর তৈলঙ্গ স্বামীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তীর্থ পর্যটনে বের হলেন এবং জ্যোতি স্বামীর সাক্ষাৎ লাভ করলেন। আত্মজ্ঞান লাভ করার পর ত্রিপুরলিঙ্গ স্বামী জীব-জগতের কল্যাণ সাধন করবেন বলে লামা স্বামীকে জানালেন। লামা স্বামী প্রথমে নেপাল এবং পরে নিম্ন প্রদেশে গমনের কথা বললেন। তিনি ত্রিপুরলিঙ্গকে অষ্টাঙ্গ যোগ ও বিভিন্ন যৌগিক প্রণালী শিখিয়ে দেন। তারপর তিনি বিভিন্ন তীর্থ স্থান পরিভ্রমণ করতে করতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তিনি সমুদ্র গর্ভে অবস্থিত আদিনাথ মন্দির এবং সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ দর্শন করেন। অবশেষে তিনি ঢাকায় এসে কুর্মিটোলার এক নির্জন স্থান যেখানে খঞ্জন খাঁ নামে একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী ফকিরের দরগায় আশ্রয় নেন এবং সেই দরগায় ত্রিপুরলিঙ্গ স্বামী শিবের আরাধনা করতেন এবং একই দরগায় খঞ্জন খাঁ ফকির সাহেম আল্লহর ইবাদত করতেন। এইভাবে বেশ কিছু দিন বসবাস করার পর ঢাকা শহরের শাহবাগে এক নির্জন স্থানে ভজন করেন। তখন কিছু কিছু ভক্ত স্বামীজীকে দর্শন করতে শাহবাগে যেতেন। ইতিমধ্যে ঢাকা শহরের এক বিখ্যাত জমিদার গোপ্রেন্দ্র মোহন বসাক ওরফে আকুবাবু ত্রিপুরলিঙ্গ স্বামীজীকে দর্শন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন এবং জমিদার আকুবাবুর পুরানো ঢাকা শহরে করাতি পাড়ায় প্রায় ৪ বিঘা জমির ওপর একটি সম্পত্তি ছিল। আকবাবু মনে মনে এই স্থানটি স্বামীজীকে দান করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। পরবর্তীতে আকুবাবু ঐ স্থানে একটি বাসপোযোগী মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দির নির্মাণ করতঃ ১৮৯৯ ইং সনে ২০ বৈশাখ একটি রেজিস্ট্রিকৃত দান পত্র দলিলমূলে স্বামীজীর নামে নাম করণ করে স্বামীজীকে তা দান করেন যা আজ পর্যন্ত স্বামীবাগ আশ্রম নামে সর্বজন পরিচিত। ত্রিপুরলিঙ্গ স্বামী গোপ্রেন্দ্র মোহন বসাক কর্তৃক দান কৃত জায়গায় একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই আশ্রমটি স্বামীবাগ আশ্রম নামে খ্যাত। উক্ত আশ্রমে স্বামীজী শ্রীশ্রী ভীম শংকর শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন এবং শ্রীশ্রী মঙ্গলা চণ্ডীকেশ্বরী কালিমাতা সহ অন্যান্য দেবদেবীর বিগ্রহ স্থাপন করে সেবাপূজা করেন। এভাবেই চলতে থাকে আশ্রম। ইতো মধ্যে ত্রিপুরলিঙ্গ স্বামী প্রায় ১৫০ বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই আশ্রমটি কিভাবে রক্ষা হবে সেই কথা চিন্তা করে ১৯২২ সনের ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখে স্বামীজীর যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি শ্রীশ্রী ভীম শংকর শিবলিঙ্গ বিগ্রহের নামে একটি উলই দলিল মূলে দান করেন। উক্ত উইলে স্বামীজী আশ্রম পরিচালনার জন্য তাঁর তিন শিষ্য পুত্রের মধ্যে নরেশানন্দ সরস্বতীকে এই স্বামীবাগ আশ্রমের সেবায়েত নিযুক্ত করে ১৩২৯ বাং রামনবমী তিথিতে ১৫০ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। দেহত্যাগের পর স্বামীজীকে এই আশ্রমেই সমাধিস্থ করা হয়।

কালের অস্থিরতায়, এক সময় স্বামীবাগ আশ্রম বহু বিপর্যয়ের সন্মুখীন হয়। বহুকুচক্রী স্বামীবাগ আশ্রমকে ঢাকা শহর থেকে তাঁর ইতিহাস মুছে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু ভগবানের ইচ্ছায় পরম্পরাক্রমে নিয়োজিত স্বামীবাগ আশ্রমের বর্তমান সেবায়েত যশোদানন্দন আচার্য ২০০০ সালে স্বামীবাগ আশ্রম রক্ষার নিমিত্তে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) কে পরিচালনা, উন্নয়ন এবং সেবাইত শীপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলে ইসকন তাঁর অনুরোধ স্বীকার করে এবং দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিয়ে আসে স্বামীবাগ আশ্রমের পূর্ব ভাবধারা । অশুভ শক্তির করাল গ্রাসে স্বামীবাগ আশ্রম হারিয়েছিল তার ভক্তি চর্চার পবিত্রতা এবং ঐতিহ্য। স্বামীবাগে যে পূর্বে একজন মহাযোগী সাধনা করতেন, এখানে যে কিছু মন্দির ছিল, তা প্রায় সমস্ত সনাতন ধর্মালম্বীরাসহ ঢাকাবাসীরা ভুলেই গিয়েছিল। স্বামীবাগ আশ্রম পরিণত হয়েছিল অবৈধ কর্মকাণ্ডের আঁখড়ায়, গরু রাখার খোয়ারে, সর্বোপরি সমস্ত স্বামীবাগে একটি অসস্থিকর অবস্থা তৈরী হয়েছিল। কিন্তু যখন ইসকনকে স্বামীবাগের দায়িত্ব ভার অর্পণ করা হয় তখন থেকেই ইসকন স্বামীবাগ আশ্রমের পূর্বভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্টা শুরু করেছিল। এজন্য অবশ্য ইসকনকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। এখন এই আশ্রমে প্রায় দেড় শতাধিক ব্রহ্মচারী ভক্ত অবস্থান করছেন। যারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শ্রীল প্রভুপাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সমগ্র পৃথিবীতে শ্রীল প্রভুপাদ যেভাবে সনাতন ধর্ম বা বৈষ্ণব সংস্কৃতি প্রচার করেছেন সেই দিকে সচেতন থেকেই সারা বাংলাদেশে কৃষ্ণভাবনা প্রচার করে চলেছে। ইসকন স্বামীবাগ আশ্রম এখন ভক্তিচর্চার দিব্য পীঠে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে স্বামীবাগ আশ্রমে বিভিন্ন প্রচার বিভাগের মাধ্যমে বিভিন্নস্তর ভিত্তিক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যার ফলে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন জীবনের শুরু থেকেই পারমার্থিক অনুশীলনের সুযোগ লাভ করছে তেমনি যুব সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য রয়েছে বিবিধ ব্যবস্থাপনা। তাছাড়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে আত্মতত্ত্ব জ্ঞান প্রসারণ করে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এই লক্ষ্যে জাগ্রত ছাত্র সমাজ, ইউথ ফোরাম, ভক্তিবেদান্ত গীতা একাডেমী, মায়াপুর ইন্সটিটিউট, নামহট্ট, ভক্তিবৃক্ষ, ভাগবতীয় ক্লাস ইত্যাদি বিভাগ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিত্য সেবার সদস্য হয়ে উপার্জিত আয়ের কিছু অংশ ভগবানের সেবায় দান করার সুযোগ, তাছাড়া আজীবন সদস্য পদ লাভের মাধ্যমে মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনে অবদান রাখার পাশাপাশি বিশ্বভ্রাতৃত্বে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে, ফুড ফর লাইফ মানুষের মাঝে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ইত্যাদি সেবার মাধ্যমে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। গোবিন্দ রেষ্টুরেন্ট রকমারী কৃষ্ণ প্রসাদ সরবরাহের স্পর্শে মানুষকে পরিপূরক সাত্ত্বিক খাবারের প্রতি আকৃষ্ট করছে। মাসিক হরেকৃষ্ণ সমাচার, ত্রৈমাসিক অমৃতের সন্ধানে ইত্যাদি প্রকাশনার মাধ্যমে বিবিধ তত্ত্ব, তথ্য ও বিভিন্ন ঘটনা সম্বন্ধে জানতে পারছে। উক্ত বিভাগগুলোর একটিই উদ্দেশ্য সমাজের প্রতিটি স্তরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী

পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম

সর্বত্র প্রচার ইইবে মোর নাম।।

প্রচার করে জীবের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করা। সর্বোপরি সনাতন ধর্মের পুনঃজাগরণ ঘটানো।