ইস্‌কন এর ইতিহাস

গৌড়ীয় ভাগবত বৈষ্ণবধর্মের শাখা “গৌড়ীয় বৈষ্ণব” এর গুরু-শিষ্য পরম্পরা অনুসরণকারী আন্তজার্তিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) আধ্যাত্মিক সমাজে ‘হরেকৃষ্ণ আন্দোলন’ নামে ব্যাপক পরিচিত । ১৯৬৬ সালে নিউইয়র্ক শহরে ভারতীয় সন্ন্যাসী শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী কর্তৃক এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা হয়।

প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে ভারতের পশ্চিম বাংলায়  গৌড়ীয়-বৈষ্ণব ধর্মের গোড়াপত্তন হয়েছিল।  “গৌড়” পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশেষ স্থানের নাম এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর উপাসনাকারীর সংস্কৃতেই ‘বৈষ্ণবতা’। এভাবেই গৌড়ীয়-বৈষ্ণব নামকরনটি হয়েছে।  এই সংস্কৃতির অধিকাংশ অনুসারীই ভরেতের পশ্চিমবাংলা ও উড়িষ্যা অঞ্চলের ছিলেন। পরবর্তীতে ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীমদ্ভাগবত এবং শ্রীচৈতন্যচরিত্রামৃতের মত সংস্কৃত বা বাংলা বৈদিক শাস্ত্রগ্রন্থের ইংরেজিতে অনুবাদ করে সারা বিশ্বে এই সংস্কৃতিকে প্রচার করেছিলেন। এই গ্রন্থগুলো এখন সত্তরটিরও অধিক ভাষায় পাওয়া যাচ্ছে । এসমস্ত গ্রন্থগ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করা, তাৎপর্য উপলব্ধি করা এবং সর্বোপরি তা প্রচার করা ইসকনের একজন ভক্তের অপরিহার্য অঙ্গ।

প্রথম দিকে সংস্থাটি নানাবিধ বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছিল কিন্তু তা পরবর্তীতে অত্যন্ত সফলতার সহিত সেগুলিকে পরাস্ত করে বর্তমানে সারাবিশ্বের বিভিন্ন নেতা ও সংগঠনের দ্বারা অনাদৃত। উদাহরণস্বরূপ, নিউইয়র্কের সুপ্রীমকোর্ট ইসকনকে “বৈধ সংস্থা” হিসাবে ঘোষণা করেছে।

আমাদের সাথে পরম পুরষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রেমপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিতরূপ ভক্তিযোগ প্রচার করাই এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করার মূল উদ্দেশ্য। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রসন্ন বিধানের উদ্দেশ্যেই সারা বিশ্বের মানুষ এই সংস্থায় যোগদান করছে। ২০০৭ সালের পরিসখ্যান অনুসারে, ভারত, পূর্ব ইউরোপের রাশিয়া, ইউক্রেন ও মধ্য এশিয়ায় এই সংস্থার সবচেয়ে বেশি প্রসার হয়েছিল।

 

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইসকন ভক্তেরা গৌড়ীয়-বৈষ্ণব ধারার সর্ববৃহৎ শাখা “গৌড়ীয়-ভাগবত-বৈষ্ণব” এর অর্ন্তভুক্ত গুরু-শিষ্য পরম্পরা ধারাকে অনুসরণ করে ।

ইসকন ঈশ্বরে বিশ্বাসী বেদান্ত ঐতিহ্যের এক-ঈশ্বরবাদ প্রথার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত । এখানে শ্রীকৃষ্ণকেই সমস্ত অবতারের মূল উৎস হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এভাবেই ইসকন ভক্তেরা শ্রীকৃষ্ণকেই পরম পুরোষত্তম ভগবানরুপে আরাধনা করে এবং প্রভুপাদ তার বিভিন্ন লেখনীতে তাঁকে “পরম পুরুষোত্তম ভগবান” বলে সম্বোধন করেছেন। ইসকন অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্বে বিশ্বাসী। এই তত্ত্বটি হচ্ছে- প্রত্যেক আত্মারই শাশ্বত স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে, যা কখনই ভগবনের দিব্যজ্যোতিতে লীন হয়ে যায় না অথবা পরমসত্যে এক হয়ে যায় না যেমনটা নিরাকারবাদীরা মনে করে থাকে । গুন অনুসারে আত্মা ও পরমাত্মা অভিন্ন হলেও পরিমাণের দিক হতে আত্মা পরমাত্মার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ । উপমা স্বরূপ তারা সম্পূর্ণ মহাসাগর ও মহাসাগরের এক বিন্দু জলের তুলনা পরিবেশন করে। মহাসাগরের একবিন্দু জলে যা উপাদান রয়েছে তা মহাসাগরেও বিদ্যমান, কিন্তু পরিমাণগতভাবে তাদের মধ্যে বৃহৎ পার্থক্য রয়েছে । শাস্ত্রে বলা হয়েছে অংশ জীবের কাজ হছে পূর্ণ ভগবনের সেবা করা যার মাধ্যমে জীব আনন্দ আস্বাদন করতে পারে । এখানে ভক্তদের কাছে রাধারাণী হচ্ছেন ভগবানের আনন্দায়িনী শক্তি ও ভগবানের দিব্য প্রেমের প্রকাশরূপী নারী প্রতিভূ। তিনি ভগবানের সবচেয়ে প্রিয় ভক্ত যিনি কীভাবে ভগবানের আনন্দ বিধান করতে হয় তা পূর্ণরূপে জানেন ।

 

প্রচার কার্য:

সারাবিশ্বে কৃষ্ণভাবনা প্রচারের উদ্দেশ্যই ইসকন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে এই সংস্থার সদস্যরা পাবলিক স্থানগুলোতে হরে-কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন এবং শ্রীল প্রভুপাদ লিখিত গ্রন্থগুলো প্রচার করে থাকে। এই উভয় কার্যকেই একত্রে ‘সংকীর্তণ’ বলা হয়। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার, নাটক প্রদর্শণ ও কুইজ প্রতিযোগিতা প্রচার মাধ্যম হিসাবে অত্যন্ত সমাদৃত। রাস্তাঘাটে প্রচার এই সংস্থার একটি বৃহৎ কার্য, কখনও কখনও তারা মানুষদের ভাগবতগীতা ক্যাম্প ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে অনুরোধও করে থাকে।

ইসকন গত কয়েক বছরে এমনভাবে প্রসার ঘটিয়েছে যে বিশ্বের অনেক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রচার ও সংগঠন ভিত্তিক নীতিগুলো অনুসরণ করে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ই, বুর্ক রোসফোর্ট জুনিয়র এক জরিপে দেখিয়েছেন যে ইসকন এবং প্রত্যাশিত আগত সদস্যদের মধ্যে চার প্রকারের সংযোগ ঘটে। সেগুলো হল- স্বীয় অনুপ্রেরণামূলক সংযোগ, পাবলিক স্থানগুলোতে সংযোগ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে সংযোগ এবং এই সংস্থার কোন অত্যন্ত করুণাময় ব্যক্তির কৃপাবশত সংযোগ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতে ভক্তি অনুশীলন করার জন্য হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করার আবশ্যকতা নেই। সারা বিশ্ব জুড়ে ইসকন পরিচালিত স্কুল, রেষ্টুরেন্ট এবং ফার্ম রয়েছে। সাধারণত, ইসকনের উপার্জিত অর্থ সংগঠনের মালিকাধীন থাকে এবং তা সংগঠনের প্রচারকার্যে নিয়োজিত করা হয়। ইসকনের অনেক মন্দিরে দরিদ্রদের মধ্যে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়। সাম্প্রতিককালে ইসকন শ্রীকৃষ্ণের উপর আধারিত “কৃষ্ণোলজি” নামক প্রাতষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। ইসকন শিক্ষা মন্ত্রালয় ইসকনের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিচালনা করে এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং তৃতীয় গঠনসংক্রান্ত শিক্ষালয়গুলোকে তত্ত্বাবধান করে থাকে। এই মন্ত্রালয়  ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় শিক্ষা তত্ত্বাবধান করে এবং যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ”বৈষ্ণব প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা” তা এর উন্নয়ন ও তদারকি করে থাকে।