ইস্‌কন এর দর্শন

সারাবিশ্বে কৃষ্ণভাবনা প্রচারের নিমিত্তে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণাবৃন্দ স্বামী প্রভুপাদ ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ তথা ইসকন প্রতিষ্ঠা করেন।

ইসকন সম্পূর্ণরূপে একটি আধ্যাত্মিক সংস্থা:

ইসকন ঐতিহ্যবাহী বৈদিক সংস্কৃতির অর্ন্তগত গৌড়ীয় বৈষ্ণবতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। দুর্দশাগ্রস্থ জীবদের পরম পিতা পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের সাথে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক স্থাপন এবং তাদের নিত্য আবাস স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই শ্রীল প্রভুপাদ ইসকন প্রতিষ্ঠা করেন। ইসকন কোন প্রকার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংস্থার অন্তর্ভুক্ত নয়। মানুষের মধ্যে সুপ্ত আধ্যাত্মিকতাকে জাগরণ করাই ইসকনের উদ্দেশ্য। এই সংস্থা ভগবদগীতা, শ্রীম্দ্ভাগবতম, উপনিষদ এবং অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রের শিক্ষার ভিত্তিতে সারাবিশ্বে ভক্তিযোগ প্রচার করে। এই শিক্ষার মূল প্রবক্তা মহাবদান্য অবতার শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু যিনি কেবলমাত্র সংকীর্তণযেোগে হরিনাম করার ফলস্বরূপ কৃষ্ণপ্রেম প্রদানের লক্ষ্যে কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

‘ISKCON” শব্দের শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ:

প্রতিষ্ঠাতা- আচার্য শ্রীল অভয়চরনামৃত স্বামী প্রভুপাদ দীর্ঘ সুগভীর চিন্তা এবং বিশ্লেষণ শেষে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সহিত আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) নামক প্রতিষ্ঠানটির নামকরন করেছেন। ’আন্তর্জাতিক’ শব্দের তাৎপর্য হল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মুখঃনিসৃত অভ্রান্ত বাণীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তিনি বলেছেন-

”পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম।

সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম।।” (চৈতন্য ভাগবত, অন্ত্য খন্ড ৪/১২৬)

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যেহেতু এরকম ভবিষ্যৎ বাণীর করেছেন, তবে অবশ্যই সারাবিশ্ব জুড়ে তাঁর শিক্ষা একসময় প্রচারিত হবে- শ্রীল প্রভুপাদের এ ব্যাপারে সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল। ষোড়শ শতাব্দিতে শ্রীল রূপ গোস্বামী বিরচিত ‘পদ্যাবলী’ নামক গ্রন্থে উল্লেখিত ‘কৃষ্ণভক্তি রসভাবিত’ শব্দাংশ অবলম্বনে শ্রীল প্রভুপাদ ‘কৃষ্ণভাবনামৃত’ ব্যবহার করেন। ‘কৃষ্ণভক্তি’ হতে ‘কৃষ্ণ’, ’রস’ হতে ‘অমৃত’ এবং ‘ভাবিত’ হতে ‘ভাবনা’ শব্দগুচ্ছো আনয়ন করা হয়- এভাবে ‘কৃষ্ণভাবনামৃত’ শব্দের আনয়ন। একারনে, এ সংস্থার সাথে যে জড়িত হয় সে ‘কৃষ্ণভাবনামৃত’ আস্বাদন করতে পারে। ‘সংঘ’ শব্দের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে “সংঘ শক্তি কলৌ-যুগে”- অর্থাৎ এ যুগে সংঘতাই শক্তি। যে দেশ বা সংস্থা যতবেশি সংঘবদ্ধ, তা ততবেশি শক্তিশালী। অন্যদিকে শাস্ত্রের নির্দেশ হচ্ছে- ”সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ করা, তাঁকে কখনোই ভুলে না যাওয়া”। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ISKCON” শব্দটির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- I=IS, K=Krishna Consciousness এবং ON- IS Krishna Consciousness ON? অর্থাৎ- আপনি কী কৃষ্ণভাবনামৃত আছেন? আপনি কী সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ করছেন?

এ সমস্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে শ্রীল প্রভুপাদ এ সংস্থার নাম “কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ” প্রণয়ন করেছেন। শ্রীল সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী  ‘পাশ্চাত্যে কৃষ্ণভাবনা প্রচার’ শীর্ষক গ্রন্থে শ্রীল প্রভুপাদের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন “ আমরা আমাদের সংস্থার নামকরন করব ‘ইসকন”। হাস্যরত হয়ে শ্রীল প্রভুপাদ সর্বপ্রথম ‘ইসকন’ শব্দের এক্রোনিম (বিভিন্ন শব্দের আদ্যক্ষর দিয়ে গঠিত সংক্ষিপ্ত নির্দেশক শব্দ) প্রদান করেন। এই সংস্থাটির গঠন প্রণালীর বৈধতা সংক্রান্ত কর্মকান্ডের সময় এ ঘটনাটি ঘটে। এরও পূর্বে তিনি তার এক পত্রে এবং ‘দি ভিলেজ ভয়েস’ নামক পত্রিকায় এক প্রবন্ধে কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ সম্বন্ধে উল্লেখ করেছিলেন। প্রভুপাদকে যদিও পাশ্চাত্যবাসীর কাছে প্রাসঙ্গিক হবার কারণ দেখিয়ে ’কৃষ্ণ-কনসাসনেস ’ শব্দের পরিবর্তে ‘গড্ কনসাসনেস’ ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ব্রত ছিলেন। প্রভুপাদের মতে ’গড কনসাসনেস’ কোন সুনির্দিষ্ট ধারণা প্রদান করে না, কিন্তু কৃষ্ণ নামটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিক। আধ্যাত্মিকতার বিচারে ‘গড্ কনসাসনেস’ নামটি অত্যন্ত দুর্বল এবং নির্বেশেষ। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে যদি পাশ্চাত্যবাসীরা কৃষ্ণকে ভগবান হিসাবে না জানে, তবে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বিশ্বের সর্বত্র শ্রীকৃষ্ণের গুণমহিমা প্রচার করবে। এটিই তার লক্ষ্য ছিল এবং কৃষ্ণভাবনাকে বিশ্বজুড়ে প্রচার করার জন্য তিনি দৃঢ় বিশ্বাসের সহিত প্রস্তুত হয়েছিলেন।

প্রভুপাদ প্রায়শই তার বক্তৃতায় ব্যক্ত করতেন যে কৃষ্ণভাবনামৃতের লক্ষ্য হল মনুষ্যজাতিকে আধ্যাত্মিক মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা করা। ভগবানের সাথে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই মনুষ্য জন্মের উদ্দেশ্য। ইসকন প্রতিষ্ঠার পিছনে প্রভুপাদের এক বৃহৎ পরিকল্পনা ছিল। মানুষের সকল প্রকার সমস্যার সমাধান এবং জীবের প্রকৃত স্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংস্থাটির ক্ষমতা রয়েছে।

দুর্নিবার এই কলিযুগে জীবহত্যা, অবৈধ সঙ্গ, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ এবং জুয়া খেলার দরুন মানুষদের মধ্যে সততা, শুচিতা, মহানুভবতা অথবা তপস্যা নেই। তাই এই সংস্থার সদস্যরা হরে-কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার পাশাপাশি উপরে উল্লেখিত পাপ কাজ হতে বিরত থাকে। এভাবে তারা ভক্তি অনুশীলনে উন্নতি করার মাধ্যমে তাদের পরম লক্ষ্য ভগবদ্ ধাম প্রাপ্তির পথে এগিয়ে যায়।

 

ইসকনের ৭টি উদ্দেশ্য:

  1. সুসংবদ্ধ-ভাবে মানবসমাজে ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান প্রচার করা এবং সমস্ত মানুষকে পারমার্থিক জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত হতে শিক্ষা দেওয়া, যার ফলে জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বিভ্রান্তি প্রতিহত হবে এবং জগতে যথার্থ সাম্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
  2. ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতের অনুসরণে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করা।
  3. এই সংস্থার সমস্ত সদস্যদের পরস্পরের কাছে টেনে আনা এবং শ্রীকৃষ্ণের কাছে টেনে আনা, এইভাবে প্রতিটি সদস্য-চিত্তে এমনকি প্রতিটি মানুষের চিত্তে সেই ভাবনার উদয় করানো, যাতে সে উপলব্ধি করতে পারে যে, প্রতিটি জীবই হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন অংশ।
  4. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রবর্তিত সমবেত ভগবানের দিব্য নাম কীর্তন করার যে সংকীর্তন আন্দোলন, সে সম্বন্ধে সকলকে শিক্ষা দেওয়া এবং অনুপ্রাণিত করা।
  5. সংস্থার সদস্যদের জন্য এবং সমস্ত সমাজের জন্য একটি পবিত্র স্থানে নির্মাণ করা যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্যলীলা-বিলাস করবেন এবং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে তা নিবেদিত হবে।
  6. একটি সরল এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক জীবনধারা সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সদস্যদের পরস্পরের কাছে টেনে আনা।
  7. পূর্বোল্লিখিত উদ্দেশ্যগুলি সাধন করার জন্য সাময়িক পত্রিকা, গ্রন্থ এবং অন্যান্য লেখা প্রকাশ এবং বিতরণ করা।

 

ইসকনের ৪টি প্রধান স্তম্ভ:

১) শুদ্ধতাই বল

২) গ্রন্থই সমস্ত কিছুর ভিত্তি

৩) একতা হল নীতি

৪) প্রচারই মুখ্য

 

শ্রীল প্রভুপাদ এমনভাবে এই ৪টি স্তম্ভকে নির্মাণ করেছেন যে তা আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এ সম্বন্ধে ডঃ এম, এন, ব্যেসম বলেন- “ শ্রীল প্রভুপাদ এমন একটি গৃহ নির্মাণ করেছেন যে যেখানে সমস্ত বিশ্ববাসী একসাথে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে।”